নানামুখী কর্মকাণ্ডে দেশ খাদ্য উৎপাদনে অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও এখনো সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। খাদ্য ব্যবসায় জড়িত কিছু অতি মুনাফাকারী এবং ভেজালচক্রের দৌরাত্ম্য ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। দীর্ঘদিন ধরেই এসব অনিরাপদ খাদ্যের কারবারিরা তৎপর থাকলেও তাদের অপতৎপরতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ছিল।
নানা সময়ে এদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর ও বিএসটিআইর অভিযান পরিচালিত হলেও কার্যত কাঙ্খিত ফল আসেনি। একই প্রতিষ্ঠানকে বারবার জরিমানা করার পরও পরবর্তী সময়ে একই অপরাধ পাওয়া গেছে। অভিযান বন্ধ হলেই অসাধু ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধের বিষয়টিতে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকার ২ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। একনেক উইং সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘ফুড সেফটি ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ নামে এ প্রকল্পের অনুমোদনও দেয়া হয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ভেজাল খাদ্য রোধে এবং খাদ্য নিরাপত্তার সক্ষমতা বাড়াতে ঢাকায় রেফারেন্স ল্যাবরেটরির অফিস ও প্রশিক্ষণ ভবন স্থাপন করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে খাদ্যে ভেজাল রোধ, নকল পণ্য ও কৃষিজাত পণ্যের মান ঠিক থাকবে। প্রথম পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার জন্য বিশদ নকশা প্রণয়নসহ অফিস অথবা ল্যাব নির্মাণ কার্যক্রম তদারকি করা হবে। বলা হয়েছে, মাছ, মাংস, ডিম ও দুধে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া ডিমে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। এসব খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যের মান ঠিক রাখতে এই প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়।
বাজারে গ্রাহকের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির নাম ও লোগো ব্যবহার করে চলছে রমরমা ব্যবসা। এসব মানহীন খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যের কারণে রপ্তানিতেও খুব একটা খ্যাতি অর্জন সম্ভব হয়নি। এ প্রকল্পের মাধ্যমে এসব বিষয়েও উন্নতি ঘটানো হবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ভেজাল খাদ্য, নকল পণ্য ও বাজার তদারকিতে ১৫ হাজার ১৬১টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে জরিমানা আদায় হয়েছে ১০ কোটি ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৫০ টাকা। এর আগের অর্থবছরে ২৪ হাজার ২২৩টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। হিসাব পর্যালোচনা করলে চলতি অর্থবছরে জরিমানা আদায়ের প্রতিষ্ঠান কমেছে ৯ হাজার ৬২টি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজার তদারকিতে ২৫ হাজার ৬৪৫টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয় ১৮ কোটি ৮৫ লাখ ৮০ হাজার ৮০০ টাকা।
খাদ্যে ভেজাল রোধ, নকল পণ্য এবং বিদেশে রপ্তানিতে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে নিরাপত্তা পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। যার ফলে বিশ্বমানের খাদ্য টেস্টিং এবং খাদ্যপণ্য রপ্তানিও বাড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় ‘ফুড সেফটি ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ অনুমোদন দেয়া হয়। একনেক সভা শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বিশ্বের যেকোনো দেশে ফুড সেফটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে গেলে পাঁচ বছরের পরিবর্তে ১০ বছর সময় লাগবে বলে মত দিয়েছে দাতা সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের মান যাচাইয়ে প্রকল্পে বিশ্বমানের টেস্টিং ল্যাব থাকবে। এতে আন্তর্জাতিক মানের টেকনোলজি ব্যবহার করা হবে। তিনি আরো বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে খাদ্যে ভেজাল রোধ, নকল পণ্য ও কৃষিজাত পণ্যের মান ঠিক থাকবে। এর ফলে আমাদের দেশীয় পণ্য রপ্তানি বাড়বে।
একনেক উইং সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট খরচ হবে ২ হাজার ৪০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের খরচ হবে ৩৯০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। প্রকল্পে জাইকা ঋণ সহায়তা দেবে ২ হাজার ১৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। দেশের তিন বিভাগ ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের তিন সিটি করপোরেশন এলাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, এ প্রকল্পের মাধ্যমে খাদ্য পরিদর্শন এবং নমুনা সংগ্রহ প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা, নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে দক্ষ কর্মী গড়ে তোলা, খাদ্য পরীক্ষা ঝুঁকি নিরূপণ, বিশ্লেষণ এবং খাদ্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য এবং সামুদ্রিক খাদ্যসহ সব ধরনের দেশীয় ও আমদানিকৃত খাদ্য অথবা খাদ্যপণ্যের নিরাপদ উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিতসহ খাদ্য রপ্তানি বাড়বে। ফলে রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে বলে মনে করছে কমিশন।