১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিআর সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসসহ আরও কয়েকটি এলাকায় গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী।
ভয়াবহ ওই হত্যাযজ্ঞের পর থমথমে এক ভয়াল নগরীরে পরিণত হয়েছিল ঢাকা। আকস্মিক হামলা ও মৃত্যুর ঘটনায় রীতিমত স্তম্ভিত তখন শহরটির বাসিন্দারা।
অভিযান শুরুর আগেই অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করেছিল পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক সরকার। রাস্তায় ছিল সেনা টহল, ফলে মানুষের বাইরে বের হওয়ার সুযোগ সেভাবে ছিল না।
বেশিরভাগ এলাকাতেই বিকল ছিল টেলিফোন, রেডিওতেও পাওয়া যাচ্ছিলো না ঠিকঠাক খবর। এর মধ্যেই যত্রতত্র শোনা যাচ্ছিলো গুলির শব্দ।
ফলে দেশের পরিস্থিতি ও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল।
এদিকে, হামলা ও হত্যাযজ্ঞের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কারফিউয়ের মধ্যেই শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে মানুষ ঢাকা ছাড়তে শুরু করে।
কিন্তু ওই অবস্থার মধ্যেও যারা ঢাকায় ছিলেন, কেমন ছিল তাদের অভিজ্ঞতা?
অবরুদ্ধ নগরী
পঁচিশে মার্চ রাতের হত্যাযজ্ঞের ঘটনার পরের কয়েক দিনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ঢাকা শহর কার্যত এক অবরুদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়েছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে পাওয়া যায়।
বিশেষ করে, ২৬শে মার্চ সকালে শহরটির যেকোনো জায়গা থেকেই আগুন আর ধোঁয়া থেকেই রাতের আক্রমণের তীব্রতা বোঝা যাচ্ছিলো।
বিভিন্ন এলাকায় শোনা যাচ্ছিলো গুলির শব্দ।
‘একাত্তরের দিনগুলি’ নামে বইতে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক জাহানারা ইমাম লিখেছেন, “অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ। যা তাণ্ডব হচ্ছে চারদিকে, কারফিউ না দিলেও বাইরে বের হয় কার সাধ্যি! গোলাগুলির শব্দ থামেই না। মাঝে মাঝে কমে শুধু।
আগুনের স্তম্ভ দেখার জন্য এখন আর ছাদে উঠতে হয় না। দোতলার জানালা দিয়েই বেশ দেখা যায়। কালো ধোঁয়ায় রৌদ্রকরোজ্জ্বল নীল আকাশের অনেকখানি আচ্ছন্ন।”
বিভিন্ন স্মৃতিকথায় জানা যায়, তখন ঢাকার বেশিরভাগ এলাকাতেই টেলিফোন সংযোগ পাওয়া যাচ্ছিলো না।
আবার কারফিউয়ের কারণে বাইরেও বের হওয়ারও উপায় ছিল না। এ অবস্থায় বাইরে ঠিক কী ঘটছে, তা নিয়ে ঘরবন্দি নগরবাসীর মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাজ করছিল।
“টেলিফোন বিকল, রেডিও পঙ্গু, বাইরে কারফিউ- গোলাগুলির শব্দের চোটে প্রাণ অস্থির, বাইরে কি হচ্ছে কিছুই জানবার উপায় নেই,” লিখেছেন জাহানারা ইমাম।
একই সময়ের বর্ণনা পাওয়া যায় কবি সুফিয়া কামালের লেখা ‘একাত্তরের ডায়েরি’ নামের আরেকটি বইতে।
১৯৭১ সালের ৩০শে মার্চ নিজের দিনলিপিতে তিনি লিখেছেন, “শোনা যাচ্ছে, মুজিব বন্দি। ওদিক থেকে আগুনের আভা দেখা যাচ্ছে। আজ রাত দশটা পর্যন্ত। রেডিওতে ইয়াহিয়া ভাষণ দিল। আওয়ামী লীগ বন্ধ। মুজিব শর্তে আসেননি, সামরিক শাসন অমান্য করেছেন বলা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত মেশিনগানের শব্দ আসছে। মানুষের শব্দ কোথাও নেই, ঘর থেকে বের হতে পারছি না।”
টেলিফোন সংযোগ না থাকা এবং বেতার স্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঢাকার বাসিন্দারা অন্য এলাকার কোনো খবর নিতে পারছিলেন না। ফলে অনেকেরই দিন কাটছিলো অস্থিরতায়, আতঙ্কে।
“কতদিন হয়ে গেল। চাটগাঁর কোনো খবর নেই। কওসার সিলেটে, তারও কোনো খবর নেই। আমার দোলন ওর স্বামী-সন্তান, সংসার নিয়ে কিভাবে আছে। আছে, না মরে গেছে জানি না। মন অস্থির। নামাজ পড়ি, কোরান পড়ি, মন অস্থির…আতঙ্কে-আশঙ্কায় মানুষের রাত-দিন কাটছে,” লিখেছেন কবি সুফিয়া কামাল।
দলে দলে শহর ত্যাগ
কারফিউ বলবৎ থাকায় ঘর থেকে বের হওয়ার মতো পরিস্থিতি তখন ছিলো না। মোড়ে মোড়ে ছিল সেনা টহল।
কিন্তু এর মধ্যেও প্রাণ বাঁচাতে ২৬শে মার্চের দুপুরের পর থেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষ দলে দলে ঢাকা ছাড়তে শুরু করে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক আফসান চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “পাকিস্তান বাহিনীর নৃশংসতার খবর জানাজানি হওয়ার পর দেখা গেলো ২৬শে মার্চ দুপুর থেকেই মানুষ শহর ছাড়তে শুরু করলো। কারফিউয়ের কারণে তখন গাড়ি-ঘোড়াও চলছিল না। ফলে পায়ে হেঁটে বা যে যেভাবে পেরেছে, সেভাবে শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে গেছে।”
মি. চৌধুরী জানান যে, মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে যারা ঢাকা ছেড়ে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে বড় একটি অংশই ছিল নিম্নবিত্ত, বিশেষত বস্তির বাসিন্দা।
“কারণ পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিআর সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইন-এগুলোর পাশাপাশি ঢাকার বস্তিগুলোতেও অপারেশন চালিয়েছিল। অসংখ্য বস্তি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।”
তখন বস্তিতে আগুন দেওয়ার কারণ হিসেবে গবেষক মি. চৌধুরী বলছেন, “বস্তি থেকে যেহেতু অনেক মানুষ তখন মিছিল-মিটিংয়ে যেত, সেকারণে পাকিস্তানিদের একটা ভয় কাজ করেছিল ছিল যে, বস্তি থেকে প্রতিরোধ আসতে পারে।”
তখন যারা ঢাকা ছেড়ে গিয়েছিলেন, তাদেরই একজন রশিদা বাশার।
বিবিসিকে ২০২১ সালে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে ঢাকার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “যেদিন যুদ্ধ শুরু হয়, সেদিন এমন গোলাগুলি হইতেছিল যে, পাকিস্তানি সৈন্যদের ছোড়া বুলেট আমাদের ঘরের উঠানে এসে পড়েছিল।”
সেসময় রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা মিজ বাশারদের বাড়িতেও ঢুকে পড়েছিল।
“তখন আমাদের দোতলায় এক বিহারি ছিল। ভাড়া থাকতো। সে বেরিয়ে এসে তাদের সঙ্গে উর্দুতে কথা বলে। বলেছে, এটা তাদের বাসা। যার জন্য তারা আর কিছু করেনি,” বলেন মিজ বাশার।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করা করা হতো।
ছবির ক্যাপশান,১৯৭১ সালে সামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ঢাকার পত্রিকাগুলোয় দেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা হতো না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করা করা হতো।
পরদিন সকালে তারা প্রাণ বাঁচাতে পরিবার নিয়ে এক কাপড়ে বাসা ছেড়ে বের হয়ে যান। ঢাকার জিঞ্জিরা থেকে নৌকা ভাড়া করে নদীপথে চলে যান গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে।
কেবল ঢাকা শহর নয়, অনেকে তখন দেশও ছেড়ে গিয়েছিলেন। বিশেষ করে, অন্য দেশের নাগরিকরা যারা তখন ঢাকায় অবস্থান করছিলেন, তারা নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে থাকেন।
১৯৭১ সালের সাতই এপ্রিল কবি সুফিয়া কামাল নিজের ডায়েরিতে লিখেছেন, “আজ সকালে জমিলারা করাচী গেল। কত মানুষ যে ঢাকা ছেড়ে, বাংলাদেশ ছেড়ে গেল। ঘোড়াশালের সার ফ্যাক্টরি বন্ধ বলে রাশিয়ান কর্মচারী অনেকেই আজ গেল।”
দিন কাটে খবরের অপেক্ষায়
পঁচিশে মার্চ ঢাকাবাসীর উপর আক্রমণের খবর যাতে দেশের বাইরে প্রচারিত না হয় সেজন্য বন্দুকের মুখে সকল বিদেশী সাংবাদিককে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল আটকে রাখা হয় এবং পরে করাচী পাঠিয়ে দেয়া হয়।
বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতের ঢাকার পরিস্থিতি ও শেখ মুজিবকে আটকের ঘটনা ২৭শে মার্চেই বিশ্বের অন্তত ২৫টি দেশের পত্রিকা বা সংবাদ সংস্থার খবরে প্রকাশিত হয়।
ব্রিটেনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার তরুণ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চোখ এড়িয়ে থেকে যেতে সক্ষম হন।
পরে তিনি পূর্ব পাকিস্তান থেকে ব্যাংককে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা তুলে ধরে যে প্রতিবেদন পাঠান, সেটি ৩০শে মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ছাপা হয়।
এ ঘটনার পর বর্হিবিশ্ব থেকে চাপ আসতে থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালায় তৎকালীন সামরিক সরকার।
এপ্রিলের শুরুর দিকে খুলে দেওয়া হয় অফিস আদালত। বিভিন্ন এলাকায় ফিরে আসতে থাকে টেলিফোন সংযোগ। বেতার স্টেশনগুলোও চালু করা হয়।
“তখন ঢাকার মানুষের দিন কাটতে থাকে খবরের অপেক্ষায়। যার যার বাড়িতে রেডিও আছে, সবাই দেখা যাচ্ছে সারা দিন সেটার সামনে বসে থাকে। দেশের পরিস্থিতি কেমন, কোথায় কী হচ্ছে, সেগুলো জানার চেষ্টা করে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক আফসান চৌধুরী।
কিন্তু ঢাকার গণমাধ্যমগুলো তখন ছিলো পুরোপুরি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।
তারা দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করার কারণে বাস্তব চিত্র সেখানে প্রকাশ করা হতো না বললেই চলে।
“সরকারি কর্মচারীরা প্রাণের ভয়ে কেউ কেউ কাজে যোগ দিচ্ছেন। সব কিছু স্বাভাবিকভাবে চলছে বলে রেডিও, খবরের কাগজে প্রচার হলেও অফিস ফাঁকা, বাজার ফাঁকা। পাঁচটার পর রাস্তাঘাটে লোক চলাচলও কম,” ১৯৭১ সালের ২০শে এপ্রিল নিজের ডায়েরিতে লিখেছেন কবি সুফিয়া কামাল।
এ অবস্থায় মানুষের ভরসা ছিল বিদেশি গণমাধ্যমগুলো।
“বিশেষ করে রেডিওতে বিবিসি বাংলার খবর শোনার জন্য মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো,” বলেন মি. চৌধুরী।
১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলায় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহণ করে। কিন্তু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকা কিংবা রেডিও’তে সেদিন খবরটি প্রচার করা হয়নি।
ঢাকার বাসিন্দারা খবরটি পেয়েছিলেন অন্য দেশের গণমাধ্যম থেকে।
এ নিয়ে সুফিয়া কামাল লিখেছেন, “সারা দুনিয়ার মানুষকে মিথ্যা সংবাদ দিচ্ছে রেডিও পাকিস্তান এবং খবরের কাগজগুলো। চোখে দেখছি ঢাকার অবস্থা, শোকে ক্ষোভে অসহায়তায় মানুষ অস্বাভাবিক হয়ে গেছে।
আর রেডিওতে মিথ্যা প্রচার হচ্ছে। বিবিসি, ভোয়া, ইন্ডিয়া রেডিও থেকে সবাই জেনে নিচ্ছে সত্যিকার অবস্থা ঢাকার।”
পঁচিশে মার্চের পর ঢাকার বড় বড় বাজারগুলোতে আগুন দেয় পাকিস্তানি বাহিনী।
এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় গোলা-গুলি ও বোমা বিস্ফোরণ চলতে থাকায় পণ্যের সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়।
এর ফলে ঢাকায় নিত্য পণ্যের সংকট দেখা দেয়।
১৯৭১ সালের দশই এপ্রিল দিনলিপিতে কবি সুফিয়া কামাল লিখেছেন, “জানা গেল, কাল সন্ধ্যায় নিউ মার্কেটের কাঁচা বাজারটা পুড়িয়েছে। এখানে ওখানে হত্যাকাণ্ড চলছে।”
এ ঘটনার ১০দিন পর তিনি লিখেছেন, “কেমন থমথমে ভাব। বাড়ীর সামনে তিনদিন থেকে সন্দেহজনক লোককে পায়চারী করতে দেখা যাচ্ছে।
নিউ মার্কেটে দোকানপাট বেশিরভাগই বন্ধ দেখা যায়। কাজের লোক পাওয়া যাচ্ছে না। বস্তির বাসিন্দারা ঢাকা ছেড়ে বেশিরভাগ চলে গেছে।”
গবেষক আফসান চৌধুরী বলেছেন যে, ওই পরিস্থিতিতে ঢাকার বাসিন্দাদের ঘরে আগেই যেটুকু খাবার সঞ্চিত ছিল, সেটুকু দিয়েই তারা কোনোমতে দিন পার করছিলেন।
“যেমন চাল শেষ হয়ে যাবে এ আশঙ্কা থেকে আমাদের বাড়িতে তখন সকালে ভাত খাওয়া বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
বাড়িতে তখন বেশকিছু টমেটো ছিল, সকালে আমরা সেটাই দিয়েই নাস্তা সারতাম,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. চৌধুরী।