সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের রেকর্ড

আওয়ামী লীগের আমলে নামে-বেনামে ব্যাপক ঋণ দেয়া হয়েছে। সেই ঋণের সিংহভাগই এখন খেলাপি ঋণ পরিনত হয়েছে। তাই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের রেকর্ড হয়েছে। ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ২০ দশমিক ২ শতাংশ। আলোচ্য সময় শেষে ব্যাংক খাতের ঋণস্থিতি ছিল ১৭ লাখ ১১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গোপন রাখা খেলাপির সঠিক তথ্য প্রকাশের উদ্যোগ নিলে এ বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেরিয়ে এসেছে।

এর আগে ব্যাংকখাতে সর্বোচ্চ খেলাপি রেকর্ড ছিল সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে। সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ। ফলে তিন মাসের ব্যবধানে ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬০ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকখাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ কোটি টাকা।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের ঋণস্থিতি ছিল ১৬ লাখ ১৭ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। যার মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয় ৯ শতাংশ। এরপর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছিল ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। যার মধ্যে খেলাপি ঋণ ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে বিপুল অর্থ বের করে নেয়া হয়েছে, নিয়মনীতি সঠিক পরিপালনের কারণে এখন তা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ফলে ব্যাংক থেকে বিতরণ করা ঋণের ২০ দশমিক ২ শতাংশ বর্তমানে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। গভর্নর বলেন, খেলাপি ঋণ বেড়েছে। আগামীতে হয়তো আরো বাড়বে। তবে কিভাবে সমস্যার সমাধান করা যায় সে চেষ্টা করছি আমরা। বিভিন্ন আইন কঠোর করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, আমাদের কাছে যতই নতুন তথ্য আসছেÑ ততই বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। আমরা দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করতে চাই। যেসব ব্যাংক একীভূত করার দরকার সেগুলো একীভূত করবো অথবা নতুন বিনিয়োগকারী নিয়ে এসে পুনর্গঠন করা হবে। তাছাড়া আইনগত সংস্কার হচ্ছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন রিভিউ হচ্ছে। এসব শেষ হলে ব্যাংক খাত পুনর্গঠন করা হবে। মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গোপন রাখা খেলাপির সঠিক তথ্য প্রকাশের উদ্যোগ নিলে এ বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেরিয়ে এসেছে।

গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ বাড়ে ২৬ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। গত জুন শেষে এই খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২৪ হাজার ৭১১ কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ৩৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। ফলে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা, যা ছিল ওই সময়ের মোট ঋণের ২৯ দশমিক ২৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে যে অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে, তা এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করেছে। ফলে ব্যাংক থেকে বিতরণ করা ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বলেন, আমাদের ডিপোজিট গ্রোথ এখনো পর্যাপ্ত হচ্ছে না। যেটা বাড়ছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই এখানে আমাদের চেষ্টা বাড়াতে হবে। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। শুধু আস্থা ফিরিয়ে আনলেই হবে না, আমাদের রিজার্ভ আরো বাড়াতে পারলে আমরা ডিপোজিট গ্রোথ আরো স্ট্রং করতে পারবো। বর্তমান ডিপোজিট ১৭ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। সামান্য বেড়েছে, ৮ শতাংশের নিচে আছে। স্বাস্থ্যবান গ্রোথ হতে অন্তত ১৪ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশ বাড়াতে হবে। এখানে আরো বেশি কাজ করতে হবে। রিজার্ভর অবস্থা নিয়ে গভর্নর বলেন, আমাদের রিজার্ভ বর্তমানে মঙ্গলবার পর্যন্ত বিপিএম৬ হিসেবে ২১ বিলিয়ন ডলার, আর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে ২৬ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফ এর হিসেবে এই রিজচার্ভ দিয়ে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্বব নয়। তবে আমি মনে করি আইএমএফ এর লক্ষ থেকে আমরা বেশি দূরে নেই।

জিডিপিতেও আমরা অনেকটা কমফোর্ট জোনে আছি উল্রেখ করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমি মনে করি না ইমিডিয়েট কোন ক্রাইসিস ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ক্ষেত্রে আছে বা ব্যাংকিং খাতেও আছে। আমাদের ডিপোজিট গ্রোথ আরেকটু ভালো করতে পারলে আমাদের যেটুকু সংকট আছে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে আমরা একীভূত করার চেষ্টা করবো। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে আইন তৈরি হয়েছে। আমরা তা পাঠিয়ে দিয়েছি। এই আইনের সাথে আবার ব্যাংকইসুরেন্স আইন তৈরি করেছি। সেটাতে আমরা ১ লাখের জায়গায় ২ লাখ করেছি। একই সাথে অর্থায়ণের ব্যবস্থাও যেন হয় সে ব্যবস্থাও করছি। আমরা মনে করি ডিপোজিটরদের ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমরা দিয়ে দিতেক পারবো।

গভর্নর বলেন, ব্যাংকিং খাতে টাকা রেখে গ্রাহক তার টাকা পাবে নাÑ এটা হবে না। এটা আমরা হতে দিবো না। এক্ষেত্রে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে। ব্যাংক না থাকলেও গ্রাহক তার টাকা ফেরত পাবেন, এটা অমরা নিশ্চিত করছি। আমরা চাই ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী করতে। দুর্বল কোন ব্যাংক থাকলে সেগুলোকে একীভূত করে বা অন্য কোন ভাবে নতুন কোন ইনভেস্টর এনে ব্যাংকটিকে আবার টেনে তুলবো। এ প্রক্রিয়ায় আমরা কাজ করছি। আমরা আইনগত ব্যবস্থা ল’ভ্যালি এসেট কোয়ালিটি রিভিউ কার্যক্রম চলছে। ৬টি ব্যাংকে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে, আরো কয়েকটি ব্যাংকে খুব শিগগিরই কাজ শুরু করবো। সেগুলো হয়ে গেলে ব্যাংক রিভিশন এক্ট অনুযায়ী, আমরা ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠন করতে পারবো।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে, তখন মোট খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এর পর থেকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলছে। অর্থনীতিবিদেরা অনেক দিন ধরেই অভিযোগ করছেন, তৎকালীন সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট হয়েছে, যার একটা বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়েছে।